Home Lifestyle একজন নদী প্রেমী মানুষের গল্প

একজন নদী প্রেমী মানুষের গল্প

আমাদের দেশের বুক চিরে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদ-নদী। কৃষি, মৎস্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার জন্য নদী মানুষের পরম বন্ধু। আজ বলব একজন নদী প্রেমী মানুষের কথা। তিনি হল রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ফরিদুল ইসলাম। শৈশব থেকেই নদী ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর একটা আলাদা দরদ ছিল। কখনও নদীকে নিয়েছেন প্রতিপক্ষ হিসেবে আবার কখনও বন্ধু রূপে।

শৈশবঃ

‘বনের শোভা গাছ পাখালী
নদীর শোভা জল
মাছের শোভা নদ-নদী খাল
গাছের শোভা ফল।’

Government Job Circular Application on facebook
foridul-islam

প্রাচীন এই খনার বচনটি প্রতিফলিত হয়েছে একজন সাদা মনের মানুষের মাঝে। গাছের সঙ্গে যেমন লতার সম্পর্ক; মাছের সঙ্গে যেমন পানির সম্পর্ক নদীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ঠিক তেমনি। নদী যেন মিশে আছে তাঁর রক্ত, মাংস, হৃৎপিন্ড শিরা-উপশিরায়। নদীর পাড়ের মানুষ তিনি। নদীর নীবরে বয়ে চলার ঔদার্য্যের পুরোটাই হৃদয়ে ধারণ করেছেন। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে বুকে টেনে নেন, প্রায়ই চওড়া এক হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখেন আইডি কার্ডের মতো। 

ফরিদুল ইসলাম, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ‘নোহালী’ নামক তিস্তার পাড় ঘেঁষা এক অজপাড়া গ্রামে তার জন্ম। পিতা ফজির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত জোরদার কৃষক। চাষাবাদের পাশাপাশি তিনি কৃষি পণ্যের ব‍্যবসা করতেন। মা রোকেয়া বেগন ছিলেন একজন গৃহিণী। এই দম্পতির চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ফরিদুল ইসলাম ছিলেন তৃতীয়। কিন্তু প্রকৃতি বৈমুখ হওয়ায় কৈশোরের প্রাম্ভেই তিস্তার প্রবল ভাঙ্গনে সবকিছু হারিয়ে তাঁর পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। নদীর সঙ্গে ফরিদুলের পরিচয় জন্মের পূর্ব অর্থাৎ মাতৃগর্ভ থেকেই।

river-photo

তাই শৈশব থেকেই নদী ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর একটা আলাদা দরদ ছিল। কখনও নদীকে নিয়েছেন প্রতিপক্ষ হিসেবে আবার কখনও বন্ধু রূপে। তিনি এই নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো মানুষ গুলোর সংগ্রাম দেখেছেন খুব কাছে থেকে। এদের কাছ থেকে নিয়েছিলেন শক্তি ও শিখেছিলেন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার মন্ত্র।

শিক্ষা জীবনঃ

সংসারে অভাব অনটন আঘাত হানলেও দমাতে পারেনি তার শিক্ষার স্পৃহা। বাড়ির পাশের পাঠশালা থেকে প্রথম লেখাপড়ায় হাতে খড়ি ।
অতঃপর সেখান থেকে সালে এসএসসি পাশ করার পর রংপুর সরকারি থেকে এইচএসসি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতির উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর সৎ, প্রতিবাদী ও সততার জন্য ছাত্র জীবনে কিছু সময় মাওবাদী ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি পাঠ্য বিদ্যায় নয়, বিশ্বাস ছিলেন প্রকৃতি বিদ্যায়। তাই প্রকৃতিকে নিয়েছিলেন বিরাট পাঠশালা ও শিক্ষক রূপে।

সংসার জীবনঃ

সংসার জীবনে তিনি এক পুত্র সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তার শিল্পী একজন অ্যাডভোকেট, সমাজকর্মী ও মানবতাবাদী। নদীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে সারাজীবন রেখেছে সংসার থেকে অনেক দূরে। নদী হয়ে উঠেছে তাঁর আরেক সংসার আরেক দেশ, হয়ে উঠেছে জীবনের অবিচ্ছেদ্য সত্তা। স্বামীর এমন গৃহত্যাগী ও পরোপকারী কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়তই সমর্থন জানান স্ত্রী শামীমা আক্তার এবং নিজের হাতে তুলে নেন সংসারের সকল দায়িত্ব। ফরিদুল ইসলাম যখন দিন রাত পরিশ্রম করে সাহস হারিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরেন, তখন শামীমা আক্তার তাকে নতুন উদ্যমে পথ চলার করে সাহস জোগান।

foridul-with-his-wife
ফরিদুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী শামীমা আক্তার শিল্পী

চাকরি ও কর্ম জীবনঃ

জীবিকার তাগিদে প্রথম জীবনে সরকার চাকুরী গ্রহণ করলেও এর সারবস্তু কখনও ভিতরে প্রবেশ করতে পারিনি। কারন তার ভিতরের সমগ্র স্থান দখল করে ছিল নদী ভাঙ্গনে বঞ্চিত সেই সাধারণ মানুষ গুলো। বাল্যকাল থেকেই স‌ষ্টিশীল ও চ‍্যালেঞ্জিং কর্মের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল খুব বেশি। রক্তে তাঁর মিশে ছিল মানুষের কল্যাণ। তাই চাকরির প্রতি বরাবরই একটা অনিহা কাজ করত। সে কারনেই তিনি সরকারি চাকরি বেশিদূর চালিয়ে যেতে পারেননি।

1998 সালের ভয়াবহ বন্যায় যখন উত্তর অঞ্চলের মানুষ সব কিছু হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়েন তখন তিনি সরকারি উচ্চ বেতনের চাকরি স্তেফা দিয়ে এসে দাড়ালেন সাধারণ মানুষের পাশে। পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন হাঁস ও মাছের খামার। নিজের উদ্যোগেই উৎপাদন করেন মাছ ও হাঁসের খাদ্য।

river-protection-seminer
তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটির মানববন্ধন

‘তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠনঃ

ভারতে তিস্তা নদীর উপর গজলডোবা বাঁধের কারনে 1998, 1992 ও 1998 সালে সমগ্র রংপুর সৃষ্টি হয় তীব্র খরা ও মঙ্গা নামক অভিশাপ। শুকনো মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকেরা ফসল ফলাতে পারতো না আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ভাসিয়ে নিয়ে যেত কৃষকদের ঘর-বাড়ি, ফসল ও হালের গরু। অতিরিক্ত পাড় ভাঙ্গনের ফলে হাজার হাজার মানুষ বাপ দাদার বসতভিটা হারিয়ে কুটির গড়ে তিস্তার পাড়ের বাঁধের উপর। 1999 সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিস্তা পাড়ের নোহালীর চরে তাঁর নেতৃত্বে স্থানীয় খেটে খাওয়া সাধারণ কৃষক ও জেলেদের নিয়ে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গঠন করেন ‘তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’। যার শ্লোগান ছিল ‘নদীকে নদীর মতো চলতে দাও’। সেই থেকেই হাটিহাটি পায়ে পায়ে এই সংগঠনের পথযাত্রা। কাজ করে যাচ্ছেন রুধির মতো অবিরাম লোকচক্ষুর অন্তরালে।

river-protection-commity-in-brur
তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটি

‘তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’র উদ্দেশ্যঃ

তাঁর সংঘটিত সেই ‘তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’র মূল উদ্দেশ্য গুলো ছিল নিম্নরূপ-

1. নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে দিতে হবে।
2. গজলডোবা ফারাক্কা সহ নদীর বুক থেকে সকল বাঁধ উচ্ছেদ করতে হবে।
3. নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
4. নদীর বুক থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।
5. নদী পাড়ের মানুষের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
6. অবৈধভাবে ও জোর পূর্বক নদী দখল বন্ধ করতে হবে।
7. নদীতে শিল্প ও কল-কারখানর বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে।
8. নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে রামপাল সহ সকল কল-কারখানা উচ্ছেদ করতে হবে।
9. বন্যা কবলিত মানুষদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে।
10. নদীর পাড় ভাঙা রোধে টেকসই ও পরিবেশ বান্ধব বাঁধ নির্মান করতে হবে।

foridul-islam-with-river-commety

নদীর চরে চাষাবাদের প্রচলনঃ

মঙ্গাপীড়িত অসহায় মানুষদের মঙ্গা থেকে মুক্তি আনতে চরে পরিত‍্যক্ত জমিতে তিনি নতুন করে চাষাবাদের প্রচলন ঘটান। কৃষকদের মাঝে বিনামূলে বিতরন করেন ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়া, বাদাম ও আলুর বীজ। জমিতে জল সেচেন জন্য কিনে দেন গভীর পাম্প। তার উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব‍্যাপক সাড়া ফেলে। তাতে কৃষক ও জেলেরা কিছুটা সাবলম্বী হতে শুরু করে ও ধীরে ধীরে মুক্ত হতে থাকে মঙ্গা নামক ভয়াবহ অভিশাপ থেকে।

foridul-islam-with-river

ফরিদুল ইসলাম থেকে যেভাবে ‘নদী ফরিদুল’:

তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ন্যায্য পানির আন্দোলনকে বেগ দান করতে তিনি ছুটে গেছেন রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে। তাদের কে বুঝিয়েছেন নদীর গুরুত্ব; নদীর সঙ্গে ফসলের সম্পর্ক; শুনিয়েছেন রংপুরের মরুভূমির কথা।
2000 সালের অগাস্ট মাসে গঙ্গাচড়ায় নদী নিয়ে একটি বিরাট সম্মেলনের ডাক দেন। এই সমাবেশে যোগ দেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ। সেই থেকে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘নদী ফরিদুল’ নামেই পরিচিত। কেউ কেউ তাকে সম্মান করে ‘তিস্তা পাড়ের বাঁধ’ নামে অভিহিত করে থাকেন।

foridul-islam-in-river

ভাঙ্গন রোধে বিন্নার ছোবা ও বৃক্ষ রোপনঃ

ভাঙ্গনের হাত থেকে নদীর পাড় রুখতে তিনি নিজ উদ্যোগে তিস্তার দুপাড় জুড়ে লাগিয়েছেন ‘বিন্নার ছোবা’ নামে এক ধরনের বিশেষ ঘাস। যার শিকড় মাটির 20-25 ফুট গভীরে পৌঁছে মাটিকে আকড়ে রাখে জালের মত এবং ভাঙন রোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। বিন্নার ছোবার পাশাপাশি দুপাড়ে রোপন করেছেন অসংখ্য বৃক্ষ। তার উৎসাহে মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়ে তিস্তা ও ধরলার পাড় জুড়ে এখনও রোপন করে চলছেন বৃক্ষ ও বিন্নার ছোবা।

foridul-binnar-chara

হাওর বিলের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসাঃ

তিনি মনে করেন, হাওর ও নদী পরস্পর জমজ ভাই। একই অস্তিত্বে বাধা তাদের রথ। হাওরে মাছের সুস্থ প্রজনন বৃদ্ধি ও অতিথি পাখি শিকার রোধে গড়ে তুলেন জন সচেতনতা। সিলেট ও দেশের দক্ষিণ হাওর অঞ্চলের জেলেদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘মা মাছ’ ধরা নিষেধের কথা বলে শোনান। বলেন, কোন মাছ কখন ধরা উচিত। তিনি জানেন, তাঁর এসব কর্ম কখনও ইতিহাসে ঠাঁই পাবে না। তবু তিনি মশাল জ্বেলে তিমির হননের কাজ করে যাচ্ছেন রাতের পর রাত সভ্যতার অন্তরালে।

প্ররণার যোগানঃ

“গরু কিনিয়া না বয় হাল তার দুঃখ সর্বকাল ” প্রাচীন এই খনার বচন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেন স্থানীয় সম্পদের কিভাবে যথার্থ ব‍্যবহার করা যায়। ‘জাগো বাহে কোনঠে সগায়’- এই প্রতিবাদী কন্ঠস্বরটি শিখেছিলেন রংপুরের নুরুলদীনের কাছ থেকে যা তাঁর সাহস কে করেছে আরও বেগবান। অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে তিনি দৃঢ়তা সাথে বিশ্বাস করেন যে, স্থানীয় সম্পদের সুষ্ঠু ও যথার্থ ব‍্যবহার করতে পারলে মঙ্গা/দারিদ্র্যতা বিমোচনে সম্ভব ।

তাঁর অন্যান্য কর্মসূচিঃ

অবৈধভাবে নদী, খাল বিল দখল রোধের প্রতিবাধে দীর্ঘদিন থেকে তিনি করে যাচ্ছেন আপোষহীন সংগ্রাম। যেখানেই অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হয়েছে সেখানেই তিনি গড়ে তুলেছেন দুর্বার আন্দোলন। রামপাল কয়লা বিদ্যুতের মরণমুখী ফাঁদ থেকে পশুর নদী ও সুন্দরবন বাঁচাতে সূচনা কাল থেকে করে যাচ্ছেন এর বিরুদ্ধে রামপাল বিরোধী মিছিল ও মানব সমাবেশ। কল-কারখানার বর্জ্য নদী বা সাগরে ফেলার ব্যাপারে তিনি ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। কথা বলেছেন, পদ্মা নদীর ফারাক্কা বাধের বিরুদ্ধে; বলেছেন শুকিয়ে যাওয়া ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে। কাজ করে যাচ্ছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে সচেতনতা বৃদ্ধির সংকল্পে। এসব কাজের জন্য অনেক বার অনেক দল ও মানুষের রোষানলে পড়তে হয়েছে তাকে। তবুও তিনি তাঁর লক্ষ্য পিছু হঠেন নি।

foridul-islam-in-international-confarence

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংগ্রহণঃ

নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কে জোর দান করতে ছুটে গিয়েছেন নেপাল, ভারত, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন তিস্তা, পদ্মা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র মতো ধরস্রোতা নদ-নদীর মৃত্যুর কাহিনী। তুলে ধরেছেন নদী পাড়ের অসহায় প্রান্তিক কৃষক ও জেলেদের কথা। নদীর পক্ষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জোরালো ভাষায় তীব্র আক্রমণ করেছেন গজলডোবা, ফারাক্কাসহ বিভিন্ন বাঁধের বিরুদ্ধে ।

নদী নিয়ে উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারনঃ

এমন ব্যতিক্রমী কাজে কেন তিনি উদ্বুদ্ধ হলেন এ প্রশ্নের জবাবে ‘নদী ফরিদ’ জানান, নদী ও পরিবেশের প্রতি ভালবাসা তাঁর একটি সহজাত প্রবৃত্তি। নদী গুলো যখন আপন স্রোতে বয়ে চলে তখন তাঁর খুব ভাল লাগে। মানুষের মত নদীর ও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। নদী শুকিয়ে গেলে দেশ একদিন সাহারার মতো মরুভূমিতে পরিনত হবে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে বাঙালির সভ্যতা। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব নির্ভর করছে এই নদী গুলো বেঁচে থাকার উপর। বলতে গেলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি কাজ করে যান নদী ও পরিবেশ নিয়ে।

tista-rokkha-songram-committee

নদী ফরিদ আরও বলেন, ‘নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাঙালির সংষ্কৃতি। গরু, ছাগল ও মানুষের গোসল, নারীদের গৃহস্থালী কাজে নদীর পানিই ব্যবহার হয়ে থাকে। কৃষি কাজে নদীর পানি সেচ হিসেবে ব্যবহার করে অনেক কৃষক। নদীতে মাছ ধরে জিবীকা নির্বাহ করে অনেক পেশাজীবী মানুষ। নদীনালা, খাল, বিলে জলের প্রাচুর্য’র জন্যই এ দেশ নদী মাতৃক। কিন্তু নদীমাতৃক কথাটির গভীরতা আমরা আজ বুঝিনি। দেশ হচ্ছে আমাদের মা; আর নদী হচ্ছে দেশের জননী। কাজেই নদী রক্ষার জন্য সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু কলকারখানার বর্জ্য, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন করার কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগি হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় জাতের মাছ।’

নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাঁর পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী জানিয়ে তিনি আরো বলেন, পরিবেশ, প্রকৃতি, জলবায়ুর ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে নদী গুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। জীবের ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভুমিকা অনস্বীকার্য। নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, টিকে থাকবে সভ্যতা।

নদীর সঙ্গে তাঁর আত্নকথনঃ

রাত নামলেই তিনি নদীর কান্না শুনতে পান। রাত যত গভীর হয় হয় ততই বাড়তে থাকে নদীর আত্মচিৎকার! বাঁচাও! বাঁচা! বাঁচাও—-!
এসব তিনি প্রতি রাতে ঘর থেকে শুনতে পান, সবাই যখন ঘুমিয়ে পরে, তখন তিনি একা ছুটে যান নদীর পাড়ে! নদীর কাছ থেকে শুনেন কিভাবে তার মৃত্যু হলো! কথা বলেন- জলের সাথে, পাড়ের সাথে, স্তব্ধ হয়ে পরে থাকা প্রতিটি বালুকণার সাথে! কখনও হাসেন, কখনও কাদেন, কখনও বাক দাঁড়িয়ে থাকেন হিমালয়ের মতো! এভাবেই কেটে যায় তাঁর রাতের পর রাত বছরের পর বছর যুগের পর যুগ।

foridul-islam-alon

স্মৃতিচারণঃ

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় বন্ধুরা যখন এয়ার গান বা ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করত তখন এসব দেখে খুব কষ্ট পেতাম। পাখি শিকার রুখতে জোর প্রতিবাদ করতাম কখনও বা আড়াল থেকে ঢিল ছুড়ে পাখিদের উড়িয়ে দিতাম।
সে সময় শীত এলেই দল বেধে পাখি উড়ে আসত নদী, বিল ও হাওরে। নদী গুলো পানি ও মাছে পরিপূর্ণ ছিল। রাস্তার দুধারে ছিল গাছের সারি…। আর এখন কলের জীবনে মানুষ গুলো যান্ত্রিক হয়ে পরেছে। অতিরিক্ত যানবাহন দূষিত করে চলছে বায়ু, কল-কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে, নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনের গাছ, ভরাট করা হচ্ছে নদী নালা…।’

তিনি আরও জানান, যে চারণভূমিতে বসে গায়ের কবিরা রচনা করেছিলেন ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া, মলুয়া, কাজলরেখা, দেওয়ানা মদিনা মত বিখ্যাত কাহিনী.. সেই চারণভূমি আজ মরুভূমিতে পরিনত হয়েছে। যে নদীর বুকে মাঝিরা ভাটিয়ালি গান গাইতো সেই নদী জুড়ে আজ ধূধূ বালু চর। যে হাওর অঞ্চলে হাসন রাজা ও রাধালমনের মত মরমী কবিরা গীত গাইতেন, সেই হাওরের বুক জুড়ে এখন দূর্বাঘাস।

কৈশোরে তিনি দেখেছেন বাবার লাঙল-জোয়াল ও গফুর চাচার নৌকা বছরের পর বছর ধরে কিভাবে ঘুনে খেয়েছে। ইদুরে কাটতে দেখেছেন চোখের সামনে মাঝিদের জাল। সেই মঙ্গার কথা মনে হলে তিনি এখনো চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না।

নদী ও পরিবেশবাদী গানের সংগঠনঃ

নদী ও পরিবেশের কথা তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে গড়ে তুলেছেন নদী ও পরিবেশবাদী একটি গানের দল। যার মাধ্যমে উঠে এসেছে-
‘আমরা তোর না চাও দালান কোঠা, না চাও রং মহল,
ফিরাইয়া দেন হামাক তোমরা, তিস্তা নদীর জল…’, ‘তিস্তা বাঁচান ধরলা বাঁচান, বাঁচান রংপুর বাসী…’, ‘বন পুড়ছে দেশ পুড়ছে, মরছে নদীর মাছ…’, ‘নদী শুকাইল বিল শুকাইল, ফুরাইল রে বিলের মাছ…’ কিংবা ‘বাঁচাও নদীর হাওর বাওর, বাঁচাও সোনার বাংলাদেশ…’ সহ অসংখ্য কালজয়ী গণ সংগীত।

foridur-rahman-with-band-parti

বর্তমান অবস্থাঃ

বর্তমানে ফরিদুল ইসলাম ‘তিস্তা নদী রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’র সভাপতি সহ ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’ ও ‘পিপুলস সার্ক ওয়াটার ফোরাম বাংলাদেশ’-এর নির্বাহী সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রত রয়েছেন। তার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন নদী ও পরিবেশ নিয়ে জন সচেতনতা মূলক প্রোগাম।

জীবনের লক্ষ্যঃ

নদী নিয়ে জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বলেন, নদী ও পরিবেশ বান্ধব টেকসই উন্নয়ন সুখি সমৃদ্ধ নদী মাতৃক বাংলাদেশের লক্ষ্যেই তার এই সংগ্রাম।

প্রচার বিমুখঃ

আলোর বাইরে নিভৃত প্রচার বিমুখ প্রকৃতির সেবায় নিয়োজিত ‘নদী ফরিদরা’ মত মানুষদের উপর নেই সমাজের লাইট কিংবা ক্যামেরার ফোকাস। তবুও আপন মনে মানব সেবায় নিয়োজিত হয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জীবন যুদ্ধে ফরিদরা কখনও হার মানেনা; বরং জীবনই হেরে যায় তাঁদের কাছে বারবার।  দেশের প্রতিটি এলাকায় নদী প্রেমী এমন ফরিদুল তৈরি হোক এমন প্রত্যাশা সকলের।
প্রকাশনায় – সাজু বাঙালি

RELATED ARTICLE

Most Popular

বিনামূল্যে টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্যসেবা “সাড়া” এর প্রথম ফেসবুক লাইভ ” সাড়া – স্বাস্থ্য কথন”

মোঃ আরমান হোসেন দীপ্ত: গতকাল ২২ শে আগষ্ট, শনিবার রাত ৯ টায় বিনামূল্যে টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্য সেবা সার্ভিস "সাড়া" আয়োজিত ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠিত...

সাড়ায় যে সকল চিকিৎসক সাড়া দেন

কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এ সংকট মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে টেলিমেডিসিন...

হামরা তো জানি না টেলিমেডিসিন টা ফির কি?

গতকাল (১৮/০৮/২০২০) তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির কয়েকজন  সদস্য দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সাড়া টেলিমেডিসিন চিকিৎসা সেবার প্রচার করার জন্য যায়। পথিমধ্যে তারা বড়খাতা, বাউরা, ডালিয়া...

দেশের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলো “সাড়া”

গতকাল (১৮/০৮/২০২০) তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির কয়েকজন  সদস্য দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সাড়া টেলিমেডিসিন চিকিৎসা সেবার প্রচার করার জন্য যায়। পথিমধ্যে তারা বড়খাতা, বাউরা, ডালিয়া...