Home Lifestyle News রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার একটি বট গাছ!

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার একটি বট গাছ!

নীলফামারী প্রতিবেদক সাজু বাঙালি:
ডিমলা থানা থেকে 15 কিলোমিটার উত্তরে দোহল পাড়া ট্রিবাধেঁর শেষ প্রান্তে তিস্তা নদী কূল ঘেঁষে প্রকৃতির আদরে বেড়ে উঠেছেন বটগাছ টি। এই গ্রামেই তার জন্ম কেটেছে শৈশব ও কৈশোর। তাই নদীর সঙ্গে সঙ্গে বটগাছটির পরিচয় জন্মের পর থেকেই।

বটগাছ আশ্রয় বা ভরসার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সম্ভবত এ কারণেই বটগাছের সঙ্গে পরিবারের প্রধানের তুলনা করা হয়। আবহমান বাংলার গ্রামীণ জনপদে পথের ধারে, নদীর পারে, হাটে অথবা জনবিরল স্থানে ডাল-পাতায় ভরা বটগাছ পথিকের বিশ্রামের জায়গা। মানুষ, পাখি, কীটপতঙ্গের অকৃত্রিম বন্ধু। বটগাছ ঘিরে জমে ওঠে মানুষের আড্ডা, বিনোদন, সভা-সমাবেশ, মেলা ও হাটবাজার। সময়ের বিবর্তনে বটগাছের ঐতিহ্য অনেকটা হারিয়ে গেলেও গ্রামীণ জনপদে এখনও টিকে আছে অনেক শতবর্ষী বটগাছ ও গাছ নিয়ে কত শত কল্পকাহিনী।

Government Job Circular Application on facebook
বটগাছ ঘিরে আছে আমাদের শত-সহস্র বছরের ঐতিহ্য
বট গাছটির পূর্বের অবস্তা

আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে দোহল পাড়া গ্রামের কয়েকজন বৃক্ষ প্রেমী যুবক- সাইফুল্লা আল হেলাল, মইনুল, নাসির হোসেন, শাহ আলম, হামিদুল ইসলাম, সলেমান, আমজাদ, রাজু, মোশারফ, ফরমান, আদনান, শাওন ও রিপন হোসেন নিজ উদ্যোগ ও শ্রমে দোহলপাড়া ট্রিবাঁধে উপর তিস্তা নদীর পাড় ঘেঁষে বট গাছটি লাগায়। এরপর গত বারো বছর থেকে সন্তানের মতো পরিচর্যা করে আসছেন। কখনও গোড়ায় পানি ঢেলেছেন; কখনও রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োগ করেছেন ঔষুধ; গরু মহিষের হাত থেকে রক্ষা করতে গাছের চারপাশ দিয়েছেন বেড়া–।

এলাকায় সবাই তাদের কে ‘Eco Voicer বা প্রকৃতির কথক’ হিসেবে চেনে। তাদের দাবি, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য নয়, ভালো লাগে তাই গাছ লাগান। গাছের ছায়াতলে মানুষ বিশ্রাম নেয়। পাখিরা গাছের ফল খায়। এগুলো দেখলে তাদের খুব ভালো লাগে।

পথচারীদের ক্ষণিক আশ্রয়ের জন্য বটগাছ টি
বট গাছটির পূর্বের অবস্তা

গ্রীষ্মকালে তিস্তা নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারনে এ অঞ্চলে প্রকট খরা দেয়। মানুষ একটু শীতল বায়ুর সংস্পর্শ সারাদিন ছটফট করে করে। অন্যদিকে তিস্তা নদীর চরে বসবাস করে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ। তারা নিত্য প্রয়োজনীয় বেচেকেনার জন্য এই পথ ধরেই যাতায়াত করত পেরিয়ে আসত তিস্তার উত্তপ্ত বালুর স্তুপ। এই উত্তপ্ত বালুর স্তুপ পেরিয়ে আসতে অনেকের খুব কষ্ট হতো বিশেষ করে বৃদ্ধা ও ছোট শিশুদের। প্রতিদিন প্রায় ছেলেমেয়ে এই দীর্ঘ 4 মাইল বালুর পথ হেটে স্কুলে আসতে হয়। কিন্তু পথের মধ্য কোন বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল না। তাই তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে ঐসহ অসহায় পথচারীদের ক্ষণিক আশ্রয়ের জন্য বটগাছ টি রোপন করেন।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে এই বটগাছটিকে ঘিরে চলে আসছে কিছু প্রতিহিংসা মূলক নোংরা রাজনীতি। স্থানীয় চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন ও মেম্বার মো: মকবুল হোসেন বটগাছটির বৃদ্ধি রোধ করতে চালিয়ে যাচ্ছেন নানা প্রকার কূট-কৌশল।

বট গাছটির বর্তমান অবস্তা
বট গাছটির বর্তমান অবস্তা

ট্রিবাধেঁ গাছ লাগানো অবৈধ বলে অনেকবার অভিযোগ দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে। ন্যাড়া করে দিয়েছেন করেকবার বৃক্ষটির ডালাপালা। ভোট রাজনীতি কে কেন্দ্র করে এখন সেই বৃক্ষের নিচে গড়ে তুলতে যাচ্ছেন একটি বড় ঘর! যাতে কাটা পড়বে বৃক্ষের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ডালপালা।

চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন বলেন, ‘আমরা সরকারী জায়গায় ঘর তুলতেছি এখানে তো কারো কোন অভিযোগ থাকার কথা নয়, আর আমারা তো জনগনের জন্যই এই ঘর তুলতেছি।’

ইউপি সদস্য মকবুল হোসেন জোর গলায় বলেন, ‘সরকারী জায়গায় ঘর তুললে এলাকার মানুষের সমস্যাটা কোথায়? ঘর এখানেই তুলবো আর এটাই আমার শেষ কথা।’

চেয়ারম্যান মেম্বারদের এই প্রতিহিংসার কারন জানতে চাইলে রিপন হোসেন বলেন, ‘তারা পরশ্রীকাতরতার স্থান থেকেই এই কাজটি করে যাচ্ছেন। পথচারীরা যখন বৃক্ষরোপণ কারীদের প্রশংসা করে এটা তারা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারে না। আর সেই পরশ্রীকাতরতার শিকার হচ্ছেন এই নির্বাক বৃক্ষটি।’

এই বট গাছের নিচে দীর্ঘদিন থেকে ছোট একটি গালামালের দোকান করে আসছেন মনির মিয়া। তিনি বলেন, বটগাছ আকারে যেমন বড় কাজেও তেমনি; বট গাছের তুলনা কেবল বটগাছই। বটগাছের নিচে বসে থাকলে ভালো লাগে, মনে শান্তি পাই। এই শান্তি ও ভালো লাগা থেকেই তিনি এখানে দোকান পেতেছেন। বটগাছের উপর যেন কোন প্রকার সহিংসতা না হয় এ জন্য আমরা সচেনতামূলক কাজ করে যাব।

বট গাছটির বর্তমান অবস্তা
বট গাছটির বর্তমান অবস্তা

মো: জুলহাস (৪৭) বলেন, ‘এই গাছকে ঘিরে রয়েছে কয়েক বছরের ঐতিহ্য। গরমের দিনে এই ছায়া বৃক্ষটি আমাদের অনেক উপকার করে। এখানে আমরা মেলা করেছি, লোক গানের আসর জমেছে।’

মো: তৈবুল (৩১) বলেন, ‘এই গাছের আঠা পা ফাটা সারায়, বটের ছাল দেহের মেদ কমায়। হাড় মচকে গেলে এর ছাল বেটে গরম করে মালিশ করলে আরাম পাওয়া যায়। এছাড়াও বট গাছের ফল কাক, শালিক ও বাদুরের প্রিয় খাদ্য এবং শকুনও এ জাতীয় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বটের কষ থেকে নিম্নমানের রাবার তৈরি করা যায়। বট পাতা কুষ্ঠ রোগে অনেক উপকারি।’

এলাকাবাসীর অনেকে বলতেছেন এখানে ঘর তুললে সবচেয়ে বেশি উপকার হবে জুয়ারিদের। জুয়ারিরা সারাদিন এখানে বসে আরামে জুয়া খেলতে পারবে তা ছাড়া আর কোন উপকারে আসবে না এই ঘর বরং গাছটির সৌন্দর্য নষ্ট হবে।

প্রাকৃতিক রক্ষা কবচ, প্রাকৃতিক বর্ম, অক্সিজেনের বিশাল আধার আমাদের এই বট গাছ সকল মানুষের সকল প্রাণের এবং প্রাণবৈচিত্র্যের বিরাট অংশীদার।

বটগাছ ঘিরে আছে আমাদের শত-সহস্র বছরের ঐতিহ্য। বৈজ্ঞানিক নামের শেষাংশে তাই benghalensis শব্দটা দেখা যায়। বটগাছ বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম।

ভূমিক্ষয় রোধ করতে বটগাছের জুড়ি নেই। সালোক-সংশ্লেষণের সময় অন্য গাছের চেয়ে বাতাস থেকে বেশি কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ফিরিয়ে দেয়। মূল গাছ এবং গাছের ঝুরির শিকড় অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের মাটি আঁকড়ে রাখে। তুলনামূলকভাবে এ গাছে পাতা বেশি। বসন্ত ও শরৎকালে নতুন পাতা গজায়। কচি পাতার রং তামাটে। বটগাছের মঞ্জুরির গর্ভে খুবই ছোট এবং ফলের মতোই গোলাকার ফুল লুকানো থাকে।

একলিঙ্গিক ফুল পরাগায়ণের জন্য বিশেষ জাতের পতঙ্গের ওপর নির্ভরশীল। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতে বটের ফল পাকে। পাখি ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয় দালানের কার্নিস, পুরনো দালানের ফাটল ও অন্য কোনো গাছের কোটরে। এরপর সহজেই অঙ্কুরিত হয়। সম্ভবত এ কারণে পরগাছা হিসেবেও বটগাছের পরিচিতি আছে। উপযুক্ত পরিবেশে একটি বটগাছ ৫শ’ থেকে ৬শ’ বছর বাঁচতে পারে।

আয়ুবের্দ মতে, বটগাছের ছাল মধুমেহ রোগ সারাতে কাজে লাগে। গাছের কষ দাঁতের যন্ত্রণায় খুব কাজ দেয়। বাকলের গুঁড়া, গোলমরিচ, ক্ষাদিরা দিয়ে দাঁতের পেস্ট তৈরি করলে দাঁতের পাইরিয়াসহ অনেক রোগ সেরে যায়। বহুমূত্র রোগে বটের বিচির গুঁড়া কাজে লাগে। বটের ঝুড়ির গুঁড়া তাল মিছরি ও দুধ দিয়ে খেলে ডাইরিয়া ভালো হয়ে যায়।

উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, একটি বটগাছ কাটার সঙ্গে সঙ্গে তিন শতাধিক প্রজাতির আবাস নষ্ট হয়। তাই আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে পরিবেশবান্ধব বটগাছ সংরক্ষণ ও রোপণ করতে হবে।

রাত নামলেই তিনি নদীর কাছে ছুটে যান। রাত যত গভীর হয় হয় ততই বাড়তে থাকে তাদের আলাপন!
মানুষ যখন ঘুমিয়ে পরে, তখন তিনি মিশে যান নদীর জলে! কথা বলেন- জলের সাথে, পাড়ের সাথে, স্তব্ধ হয়ে পরে থাকা প্রতিটি বালুকণার সাথে! কখনও হাসেন, কখনও কাদেন, কখনও বাক দাঁড়িয়ে থাকেন হিমালয়ের মতো! এভাবেই কেটে যায় তাঁর রাতের পর রাত বছরের পর বছর যুগের পর যুগ।

বটবৃক্ষটি আমাদের মতো রাজনীতি জানেনা! সে চায় একটু স্বাধীন ভাবে বাঁচতে!!

সরকারি বেসরকারি সকল চাকরির খবর সবার আগে পড়তে আমাদের চাকরির খবর পেজে ভিজিট করুন।

RELATED ARTICLE

Most Popular

বিনামূল্যে টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্যসেবা “সাড়া” এর প্রথম ফেসবুক লাইভ ” সাড়া – স্বাস্থ্য কথন”

মোঃ আরমান হোসেন দীপ্ত: গতকাল ২২ শে আগষ্ট, শনিবার রাত ৯ টায় বিনামূল্যে টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্য সেবা সার্ভিস "সাড়া" আয়োজিত ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠিত...

সাড়ায় যে সকল চিকিৎসক সাড়া দেন

কোভিড-১৯ মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এ সংকট মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে টেলিমেডিসিন...

হামরা তো জানি না টেলিমেডিসিন টা ফির কি?

গতকাল (১৮/০৮/২০২০) তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির কয়েকজন  সদস্য দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সাড়া টেলিমেডিসিন চিকিৎসা সেবার প্রচার করার জন্য যায়। পথিমধ্যে তারা বড়খাতা, বাউরা, ডালিয়া...

দেশের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলো “সাড়া”

গতকাল (১৮/০৮/২০২০) তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির কয়েকজন  সদস্য দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সাড়া টেলিমেডিসিন চিকিৎসা সেবার প্রচার করার জন্য যায়। পথিমধ্যে তারা বড়খাতা, বাউরা, ডালিয়া...